আসাদুল্লাহ মামুন এর গল্প

দেশের মাটির লাগি

বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ১০:৪০ এএম

দেশের মাটির লাগি/ আসাদুল্লাহ মামুন

সাপের ফনার মতো মাথা তুলে রাস্তাটা দেখে নেয় আলিম, জঙ্গলের পাশ দিয়ে রাস্তা। কারা জানি যায়, কে জানে। ঝপ করে বসে পড়ে। অন্ধকার যতো গাঢ় হচ্ছে তত আশা জাগছে। অথচ মানুষের প্রত্যাশা বেশি আলোর জন্য।‌ সময় এখন অন্ধকারের দিন। হালিম জঙ্গলের মধ্যে একটা গাছে ঠেস দিয়ে অন্ধকারের জন্য অপেক্ষা করছে। কতদিন পর না ফেরা বাড়িতে।


যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি। যুদ্ধ না তো কি? দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫—৬ মাস হয়ে গেল। তবুও কেন জানি যুদ্ধটা শেষ হলো না। এবার অন্ধকারটা পাকা হয়ে গেলে, ফস করে দম ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে হালিম। তারপর ধীরে বাড়ির দিকে হেঁটে যায়। না পিছে না আগে, কেউ নাই। সামনে বাড়ি। আবছা অন্ধকারের মত মরে আছে। ঘুম ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। ফটফট করে চোখ ফাটে। ‘ভালোবাসারে হালিম ভালবাসা’ নিজেকে ধিক্কার দেয়, নিজের সাথে কথা বলে ওঠে, তারপর এক লাফে গিয়ে বারান্দায় উঠে শুয়ে পড়ে।

শরীর এলিয়ে দেয়। অস্ত্রটা আলগোছে হাত থেকে গড়িয়ে পড়ে। নিঃশ্বাড় শরীরের সবটুকু শক্তি বারান্দায় পড়ে থাকা ছেঁড়া চাটায়ের উপর ঢেলে দেয়। শরীরের রক্ত মাংস বারান্দায় পড়ে থাকা পুরাতন ভালবাসার তরকারির ঝোলে মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। গেল নয় মাস, যুদ্ধের ছয় মাস, তারপর যুদ্ধ শেষে পাঁচ মাস, এগারো মাস। কত জন মরলো, কত জন বাড়ি গেল, আমি ক্যান গেলাম না?। দাড়িওয়ালা মেজর সাহেব প্রশ্ন করেছিল, বাড়িতে যাবা? ক্যান যাবা, যুদ্ধ শেষ তাই? কেউ কোন কথা বলেনি, উত্তর করেনি।

অনেকক্ষণ পর একজন ভয়ে ভয়ে বলেছিল, হ্যাঁ তাই। তখন সবাই একই উত্তর দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন প্রশ্ন করল, যুদ্ধ করলা ক্যন? তখন এক এক জন, এক এক রকম উত্তর করেছিল। হালিম বলেছিল, ওরা মারলো, গুলি করলো, তাই আমরাও বন্দুক তুল্যা লিনু। দেশের মানুষের অধিকার আদায় করার লাগ্যা। মেজর সাহেব হালীমের কথা কেড়ে নিয়ে বলেছিল। আমরা তো দেশের লাইগ্যা, মুক্তির লাইগ্যা যুদ্ধ করেছি? সবাই বলেছিল জি আমার দেশ, আমার অধিকার, আমার মুক্তি। সবাই ঘাড় কাত করে, হ্যাঁ, হ, জি, তাই বলেছিল।


মেজর তীরের মত চোখ ফেলে বলল, তাহলে অধিকার যদি না পাই? যারা অস্ত্র দিল, ট্রেনিং দিল আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করলো, তারা যদি এখন আমাদের অধিকার কেড়ে নিয়ে যায়, এটা কি ঠিক হবে? আমরা বলেছিলাম ঠিক হবে না, কিন্তু তাহলে আমরা কি করব? আমরা একে অপরের দিকে প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। হালিম আলিমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল কেন কি হয়েছে?
যে দেশ আমরা যুদ্ধ কইরা পাইলাম, সে দেশের মাল সে দেশের জান যদি তারা লিয়া যায় তাহলে আমরা কি মেনে নিব? হালিম বলেছিল না মেনে লিবো না।


মেজর সাহেবের চোখে আগুন, মনে সাহস, আমরা সবাই থ মেরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারা কারা যারা আমাদের সম্পদ লিয়ে যায়? তারা, তারা যারা আমাদের যুদ্ধের জন্য অস্ত্র দিল তারা।
নুরুল হালিমের সেকেন্ড কমান্ড, শিক্ষিত যোদ্ধা।


প্রশ্ন করেছিল, এমন কিছু চুক্তি কি ছিল, যে যুদ্ধে জিতলে যা পাবে তার আধাভাগা তারা নিবে?। মেজর সাহেব মাটিতে বুট ঠুকে চিৎকার করে উঠল, না না না। তাহলে তারা সাহায্য করলো কেন? নুরুলের প্রশ্ন। সেটা তাদের দেশের স্বার্থের ব্যাপার ছিল। তাই বলে আমার দেশের সম্পদ, আমার বিজয়, অর্জন, হানাদারদের ফেলে যাওয়া ট্যাংক, অস্ত্র, মানুষের সম্পদ নিয়ে যাবে! আমরা কি সেটার জন্য যুদ্ধ করলাম? আমরা কি সেটা দিয়ে দিব? আমরা কি বাঁধা দিব না? নুরুল বলেছিল, না সেটা হতে পারে না। আমাদের বাঁধা দেওয়া উচিত।

অনেকে কোন উত্তর না করে বিমুঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো। তাদের মুখে কোন উত্তর আসছিল না। নুরুল মেজর সাহেবকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল, আপনি কি আর একটা যুদ্ধের ডাক দিচ্ছেন? ৯ মাস ৬ মাস ৩ মাস যুদ্ধ করে আমরা যে আলোর মুখ দেখেছি, সে আলোটা কি তারা নিভিয়ে দিতে চায়? তাহলে আমরা কি করব? সবাই প্রশ্ন করে উঠেছিলাম, কি করব, কি করব? সবাই প্রশ্ন করলে মেজর সাহেব আবারো মাটির উপর বুট ঠুকে ঠুকে বলে চলল, না শুধু শুধু যুদ্ধ করলাম, যুদ্ধ শেষও হলো। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি।

—তোমরা কি মেনে নিতে রাজি আছো, যে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি? মেজর সাহেবের কথায়, সবাই নেতিয়ে পড়া রাতের লাউ ডগা জ্যান্ত হয়ে বেড়ে ওঠার মত, স্যালাইন শরীরে শক্তি যোগানোর মতো চাঙ্গা হয়ে উঠলো। কিন্তু কেউ কিছুই বললাম না। মেজর সাহেব হতাশ। নুরুল হঠাৎ প্রশ্ন করে উঠলো, যদি কেউ না যায়? মেজর সবার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো, তখন একাই ট্যাংকের সামনে দাঁড়াব। আমার শরীর আমার দেশের মাটির মধ্যে ট্যাংক চালিয়ে কবর দিয়ে, তারপর আমার দেশের সম্পদ তারা নিয়ে যাবে।


একথা শুনে আমরা আবার রাইফেল তুলে নিয়েছিলাম, তারপর যুদ্ধ আর শেষ হলো না। এতদিন হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলাম, এখন নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। এমনটা হবে ক্যান, হলো ক্যান? জানিন্যা। তারপর যুদ্ধ আর শেষ হলো না, হতে হতে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো। মায়ের কাছে আর আসা হলো না। সীমান্ত আগলে রাখতে, রাখতে গিয়ে, মেলা জনা মরে গেল। বাদল মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাড়ি গিয়ে খবর দিয়েছিল আমি নাকি আরাক দেশের সাথে যুদ্ধ করতে যায়্যা মরে গেলছে।


মেলা দিন পর গায়ের ছোট ভাই গফুরের সাথে, দেখা হয়েছিল। সে আমাকে দেখে চমকে উঠে বলেছিল —হ্যাঁ গো ভাই, তুমি নাকি মরে গেলছো! আমি বলেছিলাম হ্যাঁ, মরেই তো আছি। গফুর চোখে মুখে ব্যথার কষ্ট মিশিয়ে বলেছিল, হালিম ভাই তুমি মরছো, তুমি মরো। বাদলা যখন তোমার মৃত্যুর খবর দিল, তখন তোমার বউ বাপের বাড়ি চল্যা গেল। তারপর শুনল্যাম নতুন বিহ্যা করাছে। তারপর গফুর হাউমাউ করে কেঁদে উঠে, মায়ের মৃত্যুর খবর টা দিয়েছিল।


নিস্তব্ধ নিশ্বাড় চিৎ হয়ে, হাত দুটো ছড়িয়ে পড়েছিল হালিম। তারপর এলোমেলো স্মৃতিগুলো মাথার মধ্যে পাক খেতে খেতে হঠাৎ ধ্বপ করে থেমে গেল। নিজেকে খুব নির্জন মনে হলো। এটা তার নিজের বাড়ি অথচ কি নির্জনতা, নির্মমতা। বউ নাই মা নাই। বাড়িটা ধীরে ধীরে সময়ের অতলে তার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। হালিম ভাবছিল, বাড়িটা মরবে তারপর আমি মরে যাব। যুদ্ধ তো মরা বাঁচার সামনাসামনি।


ভেবেছিলাম দেশের সম্পদ দেশে থাকবে। যা জিতলাম তা আমাদের। কিন্তু তা তো হলো না। সবাই সেটা বুঝলো না। এখন আবার বাড়ির বারান্দাটা আমাকে জাপটে ধরে আছে। কিসের যেন একটা শব্দ হলো। হালিম শুয়ে থাকা অবস্থায় বারান্দার বাইরের দিকে চোখ ফেলল, দেখল দুজন আস্ত যম দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে ঘোলাটে দেখায় তাদের। হাতটা ধীরে অস্ত্রের কাছে নিতে চেয়েছিল হালিম, কিন্তু হঠাৎ বারান্দার বাইরে থাকা পা দুটো ধরে টান দিয়ে বারান্দার নিচে ফেলে দিল। হালিম বলতে চেয়েছিল, আমি তো আমার দেশের জন্যই যুদ্ধ করছি, আমি আমার দেশকে ভালবাসি।

মাটি কে ভালবাসি। জীবনকে ভালবাসি। আমার আল্লাহকে ভালবাসি। তোমরা ভালোবাসো না। কিন্তু তারা বধির হয়ে গেল। তারপর আমাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চাইলো। গাঁয়ের অন্ধকার ঝিঝি ডাকা নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ বারুদের গন্ধ উঠলো। বিদ্যুৎ চমকালো। বজ্রপাত হলো। বৃষ্টি হলো রক্তের। হালিমের সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে দেশের মাটিকে আলিঙ্গন করতে চাইলো। আল্লাহ গো বলে একবার চিৎকার করে উঠেছিল। ঝিঁঝির ডাকের মধ্যে হালিমের রক্ত শুষে নিতে লাগলো ভালোবাসার মাটি। কে যেন শূন্য অস্তিত্ব থেকে বলল, ভয় নাই, এ রক্তের অনেক মূল্য। হালিম নিজেকে এলিয়ে দিল মাটির উপর। তারপর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা তারপর আবার ঝিঁঝিঁ ডেকে চলল অবিরাম।

যোগাযোগের ঠিকানা:

বাংলাদেশ বার্তা টুডে

৫৬, চানখারপুল লেন, নাজিমুদ্দিন রোড, বংশাল, ঢাকা-১১০০

ইমেইল: info@bangladeshbartatoday.com