এক লাখ নয় হাজার দুইশত পঁচাত্তরজন শ্রমিক এখন কীভাবে বাঁচবেন?
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:১৭ পিএম
বিজিএমইএ-এর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত ১৪ মাসে ১৮৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চাকরি হারিয়েছেন ১,০৯,২৭৫ শ্রমিক। এ পরিসংখ্যান আসলে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার ঘোষণা! একেকজন শ্রমিকের হারানো চাকরির পেছনে আছে একটি পরিবারের খাদ্য অনিশ্চয়তা, একটি শিশুর স্কুল থেকে ঝরে পড়া, একটি মায়ের কষ্টে ফেটে যাওয়া হাত, আর এক শ্রমিক নারীর অসমাপ্ত জীবনস্বপ্ন। অথচ রাষ্ট্র শ্রমিকবিরূপ। উপদেষ্টাদের ঠোঁটে ন্যূনতম অনুতাপ নেই, অর্থনীতিবিদরা টেলিভিশনে এখনো ‘ডলার সংকটের’ রুটিন বুলি আওড়াচ্ছেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ইতিহাস একদিকে সাফল্যের গল্প, অন্যদিকে নির্মম শোষণের ইতিহাস। আশির দশকে যখন বিদেশি ক্রেতাদের হাতে তৈরি হয়েছিল ‘চাকরির অলৌকিকতা’র মিথ, তখন থেকেই শ্রমিকদের ঘামে গড়া হয়েছিল জাতীয় প্রবৃদ্ধির ভিত। কিন্তু এই ‘অলৌকিকতা’র ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়াবহ অমানবিকতা—কম মজুরি, অমানবিক কর্মপরিবেশ, যৌন নিপীড়ন, শ্রমিক সংগঠনের উপর দমননীতি, এবং রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা।
রাষ্ট্র ও পুঁজির এই জোট—যা একসময় ‘রফতানি সাফল্য’ বলে প্রশংসিত হয়েছিল—এখন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে এক প্রকার দাসশ্রমের আধুনিক পুনরাবৃত্তিতে। প্রতিটি শ্রমিক যেন এই ব্যবস্থায় একবার ব্যবহারযোগ্য উপাদান। যতক্ষণ তার হাত কাজ করছে, সে ‘সম্পদ’; একবার অসুস্থ বা প্রতিবাদী হয়ে গেলে সে ‘অতিরিক্ত বোঝা’। এই দৃষ্টিভঙ্গিই আজ আমাদের অর্থনীতির মূল নৈতিক পতনের প্রতীক।
বিজিএমইএ তথ্য প্রকাশ করে দায় এড়াতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই তথ্যের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র কোথায়? যেদেশে শ্রমিকই জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস, সেদেশের সরকার শ্রমিকের মৃত্যু ও বেকারত্বের সংখ্যা নিয়ে নির্লিপ্ত থাকতে পারে কীভাবে? সরকার যখন ডলার সংকটের কথা বলে, তখন সে আড়াল করে ফেলে এই সত্য—ডলার আসত এই শ্রমিকের ঘাম থেকে, এই শ্রমিকের পরিশ্রম থেকে। অথচ আজ সেই শ্রমিকই অনিশ্চয়তায়, তার পেট খালি, তার সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে।
এটি অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক সংকটও বটে। আমরা এমন এক সমাজে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে একজন শ্রমিকের বেতন না পাওয়া, বা চাকরি হারানো, আরেকজন মধ্যবিত্তের চায়ের কাপে আলোচ্য বিষয়েরও যোগ্য নয়। শহরের আলোয় পোশাকশ্রমিকদের ক্লান্ত মুখ আজ অদৃশ্য হয়ে গেছে। অথচ সেই মুখেই লুকিয়ে ছিল দেশের প্রকৃত উন্নয়নের গল্প।
আজ যখন এই শ্রমিকরা বেকার, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। শ্রমিক সংগঠনগুলো দুর্বল, রাজনীতি ব্যবসায়ীকরণে নিমজ্জিত, সংবাদমাধ্যম নিরপেক্ষতার মুখোশে নীরব। একদিকে শিল্পপতিরা বিদেশে মূলধন পাচার করছে, অন্যদিকে শ্রমিকের গায়ে লেগে আছে উৎপাদনের শেষ রক্তচিহ্ন। রাষ্ট্র এখানে কেবল দর্শক—একজন শীতল, উদাসীন দর্শক, যে নিজের জনগণের দুর্ভিক্ষও ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন’ নামে প্রচার করতে পারে!
আমাদের বুঝতে হবে—এই কারখানাগুলির বন্ধ হওয়া মানে কেবল উৎপাদনের হ্রাস নয়, এটি একটি মানবিক অবক্ষয়। যেসব নারী শ্রমিক এই শিল্পের ভরসা ছিলেন, তাদের এখন ঠাঁই হচ্ছে অনিরাপদ বস্তিতে, ঋণখেলাপি মাইক্রোক্রেডিটের ফাঁদে, এবং গার্মেন্টসের ‘সোনালি অধ্যায়’ নামক মিথ্যের ধ্বংসস্তূপে।
রাষ্ট্রের জন্য এই মুহূর্তটি এক নৈতিক পরীক্ষা। সে যদি শ্রমিককে ‘পণ্য’ নয়, ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে শেখে, তবে হয়তো এখনো পরিবর্তনের সুযোগ আছে। কিন্তু যতদিন রাষ্ট্র পুঁজির দালাল হয়ে থাকবে, যতদিন উন্নয়ন কেবল জিডিপি গ্রাফে মাপা হবে, ততদিন শ্রমিকের মৃত্যু—হোক তা রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে বা হঠাৎ বেকারত্বে—রাষ্ট্রের কাছে কেবলই পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে।
শ্রমিকের কান্না আজ আর কারও কানে পৌঁছায় না। কিন্তু ইতিহাস জানে, যে রাষ্ট্র নিজের শ্রমিকের আহাজারি শুনতে অস্বীকার করে, সেই রাষ্ট্র একদিন নিজের পতনের শব্দও শুনতে পায় না। আজ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এক গভীর সংকটে—এটি কেবল বাজারের সংকট নয়, এটি ন্যায়ের সংকট, এটি মানবতার সংকট।
যে দেশের প্রতিটি রপ্তানি আয়ের নিচে লেখা থাকে “Made by the poor hands of Bangladesh”, সেই দেশ যদি তার শ্রমিকের হাতকে ভিক্ষুকের হাতে পরিণত করে, তবে সেটি কেবল অর্থনীতির নয়, সভ্যতারও পরাজয়।
আমরা যদি সত্যিই এই রাষ্ট্রকে মানবিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে চাই, তবে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে শ্রমিকের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। শ্রমিকের কণ্ঠকে রাষ্ট্রের কানে পৌঁছাতে হবে, তার ঘামকে সম্মানের মুদ্রায় রূপ দিতে হবে। কারণ, কোনো রাষ্ট্রই টিকতে পারে না, যদি তার ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে ক্ষুধার্ত মানুষের চোখের জলে।
কবি ও লেখক: সাম্য রাইয়ান।
আরও পড়ুন
স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬ পেলেন যারা
উৎপাদন কমানোর আগে ইরান দুই মাস পর্যন্ত তেল রপ্তানি বন্ধ রাখতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকরা
গুলিবিদ্ধ সেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ