মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার মামলার রায় আজ
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৩৮ এএম
মামলার প্রেক্ষাপট
গত বছরের জুলাই–অগাস্টের ছাত্রবিক্ষোভ ও গণআন্দোলনের সময় প্রায় ১,৪০০ জনেরও বেশি প্রাণহানি ঘটেছে — এমন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে United Nations Office of the High Commissioner for Human Rights (UN OHCHR)। এই আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ই আগষ্ট পালিয়ে ভারতে চলে যান। এরপর International Crimes Tribunal – Bangladesh (ICT-BD) নামে একটি বিশেষ আদালতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ (crimes against humanity) ধারায় মামলা হয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন (জুলাই অগাস্ট) আন্দোলন চলাকালীন সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত বিতর্কিত ছিল অভিযোগ রয়েছে, হত্যা,খুন, গুম, আন্দোলনে সরাসরি গুলী, এমনকি হেলিকপ্টার ও ড্রোন দিয়ে গুলি করা হয় আন্দোলনকারীদের উপর। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য হাসিনার তৈরি করা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal – ICT) পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে তার নিজেরই বিচার করার জন্য, এবং এতে মামলা গঠন করা হয়েছে হাসিনা ও তাঁর আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রতিনিধির বিরুদ্ধে।
২. অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া
অভিযোগ রয়েছে যে, নির্বাচিত সরকারের অধীনে নিরাপদ বাহিনী, পুলিশ, এমনকি ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ।মামলায় পাঁচটি প্রধান ধারা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে অপহরণ, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, গোষ্ঠী-হত্যাসহ অন্যান্য সম্প্রসারিত অপরাধ। শেখ হাসিনা ও তার এক বা একাধিক সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিচার চলেছে।
৩. রায়ের দিন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
আদালত রায় ঘোষণা করার জন্য নির্ধারিত হয়েছে — আজ রায় ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। রায়ের আগেই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অংশে ক্রুড বোমা বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগসহ বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে — বিশেষভাবে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে “আগ্রাসী বা হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা/অগ্নিসংযোগ করলে শুট অন সাইট” (shoot on sight)-এর মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয় দেওয়া হয়েছে।
৪. সম্ভাব্য রায় ও পরবর্তী ধাপ
প্রসিকিউশন পক্ষ ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি–মানে মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে। আইন অনুযায়ী, যদি রায় দেওয়া হয়, তবে শেখ হাসিনা সশরীরে গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণ না করলে আপিল বিভাগে (Supreme Court) সরাসরি আবেদন করার সুযোগ নেই। তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ বলেছেন, রায় যদি ক্রমবিরতি হয় এবং তাঁর দল Awami League-কে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে আগামী নির্বাচন অবরুদ্ধ অথবা বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে পারে – এমন হুমকি দিচ্ছেন।
৫. আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
এই মামলার রায় শুধু ব্যক্তি-স্তরে নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও আইনশৃঙ্খলা-ব্যবস্থার ওপরও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাজনৈতিক দল ও বিরোধী পক্ষ বলছে, এটি রাজনৈতিক প্রয়োজনে দৃশ্যত সংগঠিত ব্যবস্থা — যে দাবি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরো জটিল করে তুলছে।
আদালত ও বিচারপ্রক্রিয়া
মামলাটি ICT-1-এর বিচারবার্ডে চলছে। তিন আসামি: শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল (প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী), চৌধুরী আবদুল্লা আল-মামুন (প্রাক্তন পুলিশ প্রধান)। মামলায় মোট পাঁচটি (5) অভিযোগ (charges) আনা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে: হত্যা, আপহরণ, নির্যাতন, গোষ্ঠী-হত্যা, সহায়তা ও ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। অভিযোগ গঠনের সময় “সুপিরিয়র কমান্ড দায়িত্ব” (superior command responsibility) উল্লেখ করা হয়েছে — অর্থাৎ, হাসিনার স্তরে নির্দেশনা বা অভিজ্ঞান থেকে নিরাপত্তা বাহিনী এবং পার্টি-অফের কর্মীরা কাজ করেছিলেন এমন দাবী করা হচ্ছে।
প্রধান অভিযোগ ও প্রমাণ
সমন্বিত ও পরিকল্পিত হামলা
প্রসিকিউশন বলেছে যে এই অভিযানের পেছনে একটি coordination network ছিল — আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ড্রোন, হেলিকপ্টার এমনকি পার্টি-আর্মড গ্রুপ সক্রিয় ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী শুধু প্রতিক্রিয়া জানায়নি, বরং নির্দেশমূলক ভূমিকা নিয়েছিল —Hasina ও তাঁর সহযোগীদের নির্দেশে।
নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যাকাণ্ড
রংপুর: ১৬ জুলাই-তে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, ‘অপহরণ’ বা গুলিতে একজন ছাত্র (আবু সায়েদ) মরা গিয়েছে — প্রসিকিউশন দাবি করছে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
চাঁখারপুল, ঢাকা: ৫ আগস্ট ২০২৪-এ পুলিশের গুলিতে ছয়জন অবসরপ্রাপ্ত বা শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয় — আদালতে বলা হচ্ছে, এটি “গোষ্ঠী হত্যা” (conspiracy, incitement) ছিল।
আশুলিয়া: আরও অভিযোগ রয়েছে, গুলির পরে নিহতদের দেহ পোড়ানো হয়েছে বা দাহ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। প্রসিকিউশন বলেছে, কিছু দেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, অন্তত একজন আহত অবস্থায় দাহ করা হয়েছে।
আদেশ ও নির্দেশনা
প্রসিকিউটর দাবি করেছেন, হাসিনা “কমান্ড কম্বানী” আবেদন করে ছিলেন — অর্থাৎ তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা গঠন করেছিলেন এমন একটি গোষ্ঠী, যারা পরিকল্পনা করেছিল এবং বাস্তবায়ন করেছিল এই হামলা।
এছাড়া, অভিযোগ রয়েছে যে সহ-অভিযুক্তরা (কামাল ও Mamun) নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, এবং তাদের কার্যকলাপ ছিল অংশীদারি অপরাধ প্রবণতা (“joint criminal enterprise”)।
প্রমাণের ধরন
প্রসিকিউশন পক্ষ ভিডিও ফুটেজ, অডিও ক্লিপ, ফোন কল রেকর্ড, সীমান্ত রেকর্ড এবং ড্রোন/হেলিকপ্টার চলাচলের তথ্য উপস্থাপন করেছে। ৮১ জন সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে (ও তাদের কিছু বিবৃতি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে)। তদন্তকারীরা বলছেন, অনেক দৃষ্টান্তে নির্দেশনা সরাসরি দিতে “ফোন কল” ও গোপন যোগাযোগ ব্যবহৃত হয়েছে।
আচরণগত দায়িত্ব (Command Responsibility)
হাসিনাকে সাধারণ কর্মাদেষকের চেয়ে “উচ্চ কমান্ডার” হিসেবে দেখানো হচ্ছে — তাঁর নেতৃত্ব, পরিকল্পনা, নির্দেশনা এমনভাবে যে সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনীও কার্যকরভাবে তাঁর নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছিল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আদালতে এটি প্রমাণ করা হবে যে তিনি শুধু দৃষ্টান্তহীন বা রৈখিক পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া করেননি, বরং সিস্টেমেটিকভাবে পরিকল্পিত ধরনে “অপরাধমূলক ব্যবস্থাপনা” করেছিলেন।
দেশের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা
রায়ের আগেই নিরাপত্তা বাহিনী বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছে। কিছু এলাকায় সহিংসতা, আগুন-সন্ত্রাস ও বাধাচাপা প্রতিবাদ ইতিমধ্যেই দেখা দিচ্ছে। বিরোধীপক্ষের মতে, যদি রায় কঠোর হয়, তা আগামী রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাধারণ ধর্মঘট, অথবা নতুন নির্বাচন জটিলতা আনতে পারে।
আরও পড়ুন
স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬ পেলেন যারা
উৎপাদন কমানোর আগে ইরান দুই মাস পর্যন্ত তেল রপ্তানি বন্ধ রাখতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকরা
গুলিবিদ্ধ সেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ